জীবিকার টানে সুন্দরবনে জীবন সপে দেয় সহস্র মানুষ

প্রকাশিত: ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১, ২০২০ | আপডেট: ৪:৫৬:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১, ২০২০

সময় যত দূর্বার গতিতে বয়ে যায়,আর ওরা কেবল সময়ের দেয়া দুঃখই সয়ে যায়। সুন্দরী পাতার ফাঁকে উকি দেয় পরপুরুষ সূর্য্য তবু ওরা হারায় না জীবনের ধৈর্য্য। র্জীবন জীবিকার জন্যে সংসার জীবনে বন্য পেশায় জড়ায় পুরুষেরা গোলপাতা সংগ্রহ, মাছ ধরা, গাছ কাটা, কাঁকড়া ধরা সহ  মধু আহরন করে থাকে আর অনেক ঘরের ঘরনী ব্যস্ত হয়ে পড়েন চিংড়ির পোনা ধরার কাজে।

 

ঘরের গৃহিনীরাও কখনো কখনো পুরুষের নৌকায় সুন্দরবনে যান মাছ ধরতে,কাঠ আহরন করতে।যুগের সাথে ওদের তাল মেলাতে হয়না।তাল মেলাতে হয় সুন্দর বনে দস্যু ,হিংস্র জানোয়ার আর সব চেয়ে ভয়ানক বনকর্মিদের সাথে। একদিকে জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ,বাঘের হাতে নিহত হয়েছে কেউ কেউ আক্রমনে পঙ্গুত্ব বরন করে আছে অসংখ্য বনজীবিরা তবুও স্থানীয় শিশুরাও খেলা শিখতে শিখতে ছেলে বেলা থেকেই প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে বনের কাজে। এত কষ্টের পরেও সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর বনজীবীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না। তারা জীবন জীবিকার জন্যে পরিশ্রম করে যা আয় করে তার সিংহ ভাগ নিয়ে নেয় বনদস্যু ও বনরক্ষক নামধারি কর্মকর্তা কর্মচরীরা।পরিবারের সবাই মিলে কঠিন সংগ্রাম করেও তিনবেলা ভাত জোটাতে না পেরে বনজীবীদের অনেকে আবার ফিরছে অন্য কাজে। কেউ এলাকায়, আবার কেউ দূরের শহরে।মোংলা,রামপাল শরনখোলা উপজেলা  থেকে প্রায় হাজার হাজার লোক পাড়ি দেয় ওপারের সুন্দরবনে লক্ষ একটু জীবিকার সন্ধান। এপারে লোকালয়, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কম প্রশাস্তের ছোট্ট নদী মোংলার জয়মনির শেলা নদী। এ নদীর ওপাড়ে পাড়ি দিয়ে মাঝে মাঝে এলাকার গৃহস্থদের গরু গুলো ঘাস খেতে ও দেখা যায়।ওরা হিংস্র বাঘের আক্রমনের বিপদ জানেনা।এমন গ্রাম আরো আছে শরনখোলায় আর মোড়েল গঞ্জের জিউধরা আর গুলিশাখালি গ্রাম লাগোয়া।আর বাজুয়া দাকোপে।

 

এ সকল গ্রামগুলো ঘুরে বনজীবীদের জীবন সংগ্রামের নানা তথ্য মেলে। গ্রামগুলোতে দেখা গেছে বহু কর্মহীন মানুষকে গাছের ছায়ায়, দোকানে, রাস্তার ধারে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে। কেউ কাজ হারিয়েছে পাশ পারমিট বন্ধ থাকায় কেউ বা সুন্দরবনের দস্যু বনকর্মকর্তা কর্মচারিদের অত্যাচারে।অনেকে জানায় বন কর্মকতাদের ঘুশ আর ডাকাতদের চাহিদা মেটাতে সর্ব শান্ত হতে হয়।কেউ কেউ জানায় সরকারি খাতায় মাছ কাকড়া আহরনে কেজি প্রতি দু আড়াই টাকা নির্ধারিত থাকলেও কর্মকর্তা কর্মচারীদেরর দিতে হয় চুক্তি ভিত্তিক অনেক টাকা না হলে তারা বন আইনে মামলা এমন কী ডাকাত বলে চালান দেয়ার হুমকি দেয়।অনেকে আবার বনের পোষ্য কিছু পাচার কারীদের সাথে জোন বা কামলা খাটে। কাজ ছেড়ে এখন অনেকে মাটিকাটা, কৃষি কাজ, ইটের ভাটায় শ্রম দেওয়া, নদীভাঙন রোধে বলাক বানানো, বালুর বস্তা নদীতে ফেলাসহ নানা কাজ করছে। তবে এতে মজুরি একেবারেই নেহাত কম  দেড়-দুই শ টাকার বেশি পায় না তারা।

 

এলাকার অধিকাংশ মানুষ জানালেন, এক শ্রেনীর চোরা কারবারিরা দিনের বেলায় কাঠ কেটে বন ধ্বংস করছে। অথচ বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের নিরীহ মানুষদের সেখানে যেতে নানা সমস্যা। বনে বনদস্যুদের আতঙ্ক, বাঘের ভয়। রয়েছে কুমির-কামট আর বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচরীদের ভয়। চাঁদপাই রেঞ্জের বন কর্মকর্তারা বলেন, পারমিটধারী বনজীবীরা কোনো বাধা ছাড়াই বনে কাজ করতে পারে। তবে তাদের আর আগের মতো সুন্দর বনে যাওয়ার আগ্রহ নেই বলে তাদের কেউ কেউ জানায়। জেলে বাওয়ালীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে সুন্দরবনের গা ঘেঁষে জেগে থাকা এই গ্রামগুলোর মানুষের বেঁচে থাকা নির্ভর করে বনের ওপর। বনে প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে মাছধরা, কাঁকড়া ধরা, গাছকাটা, গোলপাতা কাটা ও মধু আহরণ। এ ছাড়া বনের ভেতরে ও আশপাশের নদীতে স্থানীয়রা চিংড়ির পোনা ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেকে আবার মৌসুম ভিত্তিতে এসব কাজ করে। হয়তো বছরের তিন মাস বনে কাজ করে, বাকি সময় অন্য কাজে যায়।

 

তাছাড়া রয়েছে আর বিড়ম্বনা মাসে ১৫ দিন সুন্দরবনে যেতে পারে আর ১৫ দিন ভাটিগার গোন থাকায় কোন মাছের দেখা না মেলায় তারা সুন্দর বনে যায়না। তাই সুন্দরবনের জেলেদের ১৫ দিনের আয়ের উপর নির্ভর করে সংসার চালাতে হয়। স্থানীয় অনেক প্রবীন বনজীবিরা জানায় প্রায় ৩৫ /৪০বছর ধরে সুন্দরবনে মাছ মধু সংগ্রহ করেন। তারা জানান, বাংলা সনের চৈত্র মাসের ১৮ তারিখে মধু আহরণকারীদের পারমিট দেওয়া হয়।  তবে এ বছর করোনা মহামারীর কারনে  বেশি পারমিট না দেওয়ায় মধু আহরন কারী জেলে- বাওয়ালীরা পড়েছে এবার মহা বিপাকে। বাগেরহাটের রামপালের,মোড়েলগঞ্জের,শরনখোলার আর মোংলার কিছু কিছু জায়গার আর বস্তি গুচ্ছগ্রাম গুলোতে অধিকাংশ এলাকায় জেলে পল্লি গড়ে উঠেছে তাদের একমাত্র পেশা বনে জীবিকার সন্ধান করা ,কর্মহীন হয়ে তারা এখন দেনা গ্রস্থ হয়ে পথে বসেছে দরিদ্রতা এখন তাদের তাড়িয়ে ফেরে। বহু মানুষ জলোচ্ছাস আইলার পর স্থানীয় কিছু এনজিওর নির্মিত নাম মাত্র বেড়ী বাঁধ নির্মান তাদের আশার পথ দেখিয়েছিল নতুন বাঁধের ভেতরে ও বাইরে আশ্রয় নিয়েছে। বাঁধের দুধারে সারি সারি ছোট ঘর। কোনোমতে জীবন ধারণ সেখানে। এখন সে বেড়ী বাঁধের সাথে নদী ভাঙ্গনের মুখে নানা প্রতিকুলতা, খাবারের কষ্ট, চিকিৎসার কষ্ট এই মানুষগুলোর নিত্যসাথী। বনজীবীদের এইসব গ্রামের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায় না। যে বয়সে ওদের স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই শিশুকাল থেকেই ওরা শুরু করে বনে যাওয়ার প্রশিক্ষন। কারণ, ওদের বাবা-মা, দাদা সবাই যে বনজীবী। এই পেশাই হয়তো হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওদের দুস্তর  আগামী দিনগুলো।

 

তাই আধুনিক যুগে এ জনপদের সাধারন মানুষ একটু বিকল্প কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা পেলে তাতে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকতে পারতো এমন প্রত্যাশা সকলের।এভাবেই যুগ যুগ ধরে বনের সাথে নির্ভরশীল কিছু মানুষের জীবন যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে জীবিকার ঘানি বয়ে বয়ে।সরকার তাদের দিকে বিশেষ নজর দিলে বৃহৎ জনগোষ্ঠির জীবন মান উন্নয়ন সম্ভব নচেৎ আঁধার তীমিরে হারিয়ে যাবে তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম।


আপনার মতামত লিখুন :

ম.ম. রবি ডাকুয়া। প্রতিবেদক। বাগেরহাট, খুলনা