মা হারা শিশু এখন আরেক মায়ের কোলে !

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০ | আপডেট: ১২:১৩:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২০
কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় নারী সদস্য নাসিমা খাতুনের কোলে শিশু মারিয়া।

বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে । বনের প্রাণী যেমন বনে সুন্দর। মানুষের ক্ষেত্রে শিশুরা তার মায়ের কোলেই সুন্দর থাকে। ঠিক তেমই ঘটেছে শিশু মারিয়ার। দুই ভাই-বোনসহ পিতা-মাতাকে হারিয়ে শিশু মারিয়ার এখন আরেক মায়ের কোলে ঠাই হয়েছে।

 

গর্ভধারিনী মায়ের কোল হারা সাড়ে চার মাসের শিশু মারিয়া এখন আরেক মায়ের মুখের দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকে। সে কখনও হাসছে, আবার কখনও কাঁদছে। মানুষ বড় ব্যাথা পেলে যেমন কাতরায় ঠিক তেমনি গত ৮ দিনে ধরে রাতে বড় মানুষের মতো কাতরাচ্ছে শিশু মারিয়া।

 

বৃহস্পতিবার (২২ আক্টোবর) সকাল থেকে কান্না-কাটি করছে। তার শরীর টা গরম, এখন মারিয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। বিষয়টি কলারোয়া ইউএনও ম্যাডামকে জানিয়েছি।

বৃহস্পতিবার বিকালে কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় নারী সদস্য ও শিশু মারিয়ার নতুন মা নাসিমা খাতুন সুন্দরবনটাইমস.কম’র এ প্রতিবেদককে এই ভাবেই কথা গুলো বলেন।

 

তিনি আরও বলেন, শিশু মারিয়া তার আশে পাশে কেউ কথা বললে সে আবার সব কথা কান পেতে শুনছে। মারিয়া ছোট-ছোট শিশুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকছে মাঝে মধ্যে। মারিয়া শুধু জানে না তার কে কে হারিয়ে গেছে। তার জন্মদাতা মা-বাবা সহ দুই ভাই-বোনকে হারিয়ে সে সর্বশান্ত।

 

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের জীবিত একমাত্র সাড়ে চার মাসের মেয়ে শিশুর দায়িত্ব নেন জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল।

 

কলারোয়া উপজেলা হেলাতলা ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় নারী সদস্য ও শিশু মারিয়ার নতুন মা নাসিমা খাতুন জানান, শিশুটিকে পেয়ে আমি আনন্দে আত্নহারা, আমি এত খুশি তা আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না। মারিয়াকে পেয়ে আমার পরিবারও খুব খুশি হয়েছে। মারিয়া আমার কাছে হাঁসছে, মাঝে মধ্যে ডুকরে কেঁদে উঠছে। মারিয়া সুস্থ্য থাকুক আপনারা সবাই দোয়া করবেন।

 

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) মৌসুমী জেরিন কান্তা জানান, শিশুটিকে ইউপি সদস্যের হেফাজতে রেখে দেখভাল করছি। তার জন্য খাদ্য ও পোশাক কিনে দিয়েছি। তার স্বাস্থ্য সেবারও ব্যবস্থা করেছি । শিশু মারিয়ার সবসময় খোজ খবর রাখছি।

 

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার(এসপি) আনিচুর রহমান জানান, আমরা আইনগত বিষয়টি দেখছি। পাশাপাশি শিশুটি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছি। তাকে দেখভাল করার দায়িত্ব আমারও রয়েছে।

 

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, শিশুটির মুখের দিকে তাকাতেই আমার মনে ভেসে উঠছে চারখুনের নৃশংসতা। শিশুটি যাতে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে আমি সে দায়িত্ব গ্রহন করেছি।

 

তিনি আরও জানান, আপাতত মেয়েশিশুকে দেখা শোনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় মহিলা সদস্য নাসিমা খাতুনের জিম্মায় রেখেছি। তিনি সাময়িকভাবে দেখভাল করছেন। পরবর্তীতে অভিভাবকরা দাবি করলে আইনানুগ ভাবে বিষয়টি সমাধান করা হবে।

 

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর’২০২০ ভোর রাতে কলারোয়া উপজেলার হেলাতলা ইউনিয়নের খলিসা  গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে মৎস্য হ্যাচারী মালিক শাহিনুর রহমান, তাঁর স্ত্রী সাবিনা খাতুন, ছেলে সিয়াম হোসেন মাহী ও মেয়ে তাসনিম সুলতানাকে জবাই করে হত্যার ঘটনা ঘটে। ত‌বে, ভাগ্যক্র‌মে বেঁচে যায় তাদের চার মাসের শিশু কন্যা মারিয়া সুলতানা।

এই হত্যাকা‌ন্ডের ঘটনায় নিহত শাহিনুর রহমানের ভাই রায়হানুল ইসলাম, খলসি গ্রামের আব্দুস সামাদের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক(২৮), আবুল কাশেমের ছেলে আব্দুল মালেক(৩৫) ও একই গ্রামের আসাদুল ইসলাম (২৭), এদের মধ্যে রাজ্জাক ও মালেক নিহত শাহিনুরের প্রতিবেশি এবং আসাদুল ইসলাম নিহত শাহিনুরের হ্যাচারির কর্মচারীসহ এখন পর্যন্ত ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

 

এদিকে, বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে নিহত শাহিনুর রহমানের ভাই রায়হানুলের স্বীকারোক্তিতে বাড়ির পাশের পুকুর থেকে হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। রায়হানুলকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীও দিয়েছে আদালতে। বড়ভাই শাহিনুল রহমান সহ পরিবারের ৪ সদস্যকে চাপাতি দিয়ে একাই হত্যা করেছে সে।

 

 

এসজি/ডেক্স


আপনার মতামত লিখুন :

নিজস্ব প্রতিবেদক। ডেক্স